২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

টেকনাফ ভূমি অফিস ঘুষ আর দুর্নীতির আখড়া!

বুধবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬

টেকনাফবার্তা২৪ডটকম

imageজেড করিম জিয়া, টেকনাফ : টেকনাফ ভূমি অফিসে টাকা ছাড়া কোন ফাইল নড়ে না, যারা টাকা দিতে পারবে অফিস কেবল তাদের কাজই করবে। দালাল এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারসাজিতে সাধারণ ভূমি মালিকেরা তাদের বৈধ সম্পত্তি নিয়ে নিয়মিত হয়রানির শিকার হওয়ায় টেকনাফ ভূমি অফিস এখন ঘুষ আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

টেকনাফের নিরক্ষর মানুষের অসচেতনার সুযোগে ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকতা-কর্মচারীর যোগসাজসে ও ভূমি অফিসের কর্মরত দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত সাধারন মানুষ চরম ভোগান্তি পড়ছে। এনিয়ে উপজেলাবাসীর হাজারো অভিযোগ থাকলেও দেখার যেন কেউ নেই। নানান অনিয়ম, দূর্নীতি ও ভোগান্তির ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তপক্ষকে অবহিত ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হলেও এর কোন সুরাহা বা সুফল এলাকাবাসী পাচ্ছে না। বিশেষ করে নামজারী মামলায় চরম হয়রানী হচ্ছে বলে জানা গেছে।

টেকনাফ ভুমি অফিসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্দে ব্যাপক হারে ঘুষ বানিজ্য ও দুর্ণীতির বেড়েই চলছে। এমনকি ঘুষ ছাড়া তাদের কলম অচল। তাদের কাজ দেখে মনে হয়, ঘুষ দিলে যেন পুরো টেকনাফ উপজেলা লিখে দিতে পারেন!

এই অনিয়ম, দুর্নীতি আর ঘুষনীতির শেষ কোথায়। এভাবে কি ঘুষের খেলা চলতে থাকবে আগামীর পথে? একটি গণতান্ত্রিক দেশের ভূমি নামক মায়ের সঙ্গে যারা অনিয়ম আর ঘুষচর্চায় লিপ্ত তাদের শাস্তি চান সমাজের শান্তিকামী সাধারণ মানুষ।

দালাল যেন কর্মকর্তাদের ডান হাত,

টেকনাফ ভূমি অফিসে দেখা গেল ভূমি কর্মকর্তাদের কাজগুলো যেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে দালালদের দেয়া হয়েছে। অফিসে কর্মকর্তা পিয়ন রয়েছে কিন্তু ভূমি অফিসের কাজ চলছে দালালের মাধ্যমে। আপাত তাদের দেখলে মনে হবে তারা সবাই ভূমি অফিসের কর্মকর্তা কিন্তু খোঁজ নিলে জানা যাবে যে তারা ঘুষের পার্সেন্টেজের সেবক।কর্মকর্তাদের টেবিলের কাজগুলো দালালরাই করছে, বিনিময়ে ঘুষের পার্সেন্টেজ। ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাÍ্যে সাধারণ মানুষের অবস্থা এখন নাকাল। শুধু বাইরের লোক যে দালাল তেমন নয়, অফিসের ভেতরের ঝাড়-দার, দারোয়ান, পিয়ন সবাই যার যার স্থান থেকে

যেন টাকা আদায় করছে।

ভূমি অফিসের কাছে যেতে মানা,
ভূমি অফিস যেন সাধারণের মানুষের কাছে এক রকম ভয়ংকর স্থানে পরিণত হয়েছে, উপয়ান্তর না থাকলে কেবল মানুষ তখনই হাজির হয় ভূমি অফিস নামক টাকা খরচের কারখানায়। অগত্যা সাধারণ মানুষ সহজে যেতে চায় না ভীতিকর ভূমি অফিসে কাছে। কারণ সবাই জানে ওখানে যাওয়া মানে টাকা খরচ। বৈধ অবৈধ কোন বিষয় নয়, যদি আপনার সমস্যাটি বৈধ হয় তার পরও টাকা দিতে হবে। কারণ ভূমি কর্মকর্তাদের জানা থাকে বিভিন্ন মারপ্যাঁচ। আর বিষয়টি যদি অবৈধ হয় তাহলে তো কেলাফতে, আপনার কাজ হয়ে যাবে তবে পকেটে টাকার পরিমান একটু বেশিই রাখতে হবে। যদিও প্রত্যেক ভূমি মালিককে ভূমি অফিসে যেতেই হয়, আর এটাই যেন কর্মকর্তাদের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। এ মনও অভিযোগ শোনা গেছে, টেকনাফর ভূমি অফিসে তথ্য জানতে গেলেও প্রার্থীকে তথ্য প্রদানের পরিবর্তে খরচের রেট জানিয়ে দেয়া হয়। কোন কাজে কত কমিশন, কে দিতে পারবে, কার ক্ষমতা কত বেশি সে বিষয়ে জ্ঞাত হয়ে ব্যক্তিকে বাসায় ফিরতে হয়েছে। তবে যে সব ব্যক্তি ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে অপটু তাদের জন্য এটা আরও ততটা ভয়ানক। বিভিন্ন ছলছুতোয় তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন।
ঘুষ চলে কত ধান্ধায়,
ভূমি অফিসে বর্তমানে যে ফন্দিতে বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে তা হল মিউটেশন বা নামজারি। ভূমি কর্মকর্তারা সাধারণ ব্যবসার মতো যার কাছ থেকে যে যত টাকা আদায় করতে পারে তার তত লাভ। সরকারি বিধি মোতাবেক নির্ধারিত টাকার চেয়ে বহুগুণ বেশি নামজারির টাকা আদায় করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভূমি অফিসে ন্যূনতম পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে নামজারির জন্য।যাদের জমির কাগজপত্রে কোন ত্র“টি নেই তাদের জন্য পাঁচ হাজার আর অন্যদের যার যেমন সমস্যা তাদের কাজের ক্ষেত্রে তত বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। আর এই নামজারির টাকা আদায়ের বিষয়টি এখন ওপেন একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যা এই মিউটিশনের টাকার পরিমাণ কয়েক বছর আগে কমই ছিল কিন্তু এখন তা আকাশ সমান বেড়েছে।

একই রকমভাবে ভূমি রাজস্ব আদায়, ভূমি জরিপ, রেকর্ড, সার্ভে রিপোর্টসহ প্রত্যেকটি কাজে নেয়া হচ্ছে অবৈধ ঘুষ। শুধুই উৎকোচের লোভে সরকারি সম্পত্তি পর্যন্ত অবৈধ দখলদারিদের হাতে তুলে দিচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

যদি কারও কাগজপত্র ঠিকও থাকে তার পরও কয়েক দিন ঘুরিয়ে বিভিন্ন ভুলভাল দেখিয়ে বলা হচ্ছে টাকা ছাড়া কাজ হবে না। সরকারি জমি বরাদ্দের নাম করে কারও কারও কাছ থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। সাধারণ জনগণ এক রকম জিম্মি হয়েই ভূমি কর্মকর্তাদের নানা ফন্দিতে নতি স্বীকার করে এ ধরনের অবৈধ টাকা প্রদানে বাধ্য হচ্ছে।
কে মানছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইন,

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আর সুবিধার কথা মাথায় রেখেই বর্তমান সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় ভূমি সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের এ আইনটি থোড়াই কেয়ারের মতো পড়ে রয়েছে।

জনগণের ভোগান্তির শেষ কোথায়,
ভূমি কর্মকর্তাদের কালো থাবা থেকে সাধারণ ভুক্তভোগী মানুষগুলো মুক্তি চান। যদিও অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার বিধান আছে কিন্তু অযথা ভোগান্তিতে পড়ার ভয়ে তারা অভিযোগ করতে যেতে ভয় পান।

ভুক্তভোগী অনেকের দাবি, ওপর মহল কাছে অভিযোগ করলে লাভ হয় না। কারণ সবাই এক প্যানেলের লোক। শুধুই ঘুষের টাকার জন্য সামান্য কাজটিও আটকে রাখা হয়। খাজনার টাকা পরিশোধ করতে এসে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়েছে এমন ঘটনাও ঘটে বলে প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করে বলেন ভুক্তভোগীরা।

তহশিল অফিস, উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের অনিয়মের কারণে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত এবং ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে বলে সচেতন মহল জানায়।

জাতীয় দৈনিকে প্রায়ই ভূমি সংক্রান্ত কর্মকর্তাদের ঘুষ, নানা অনিয়ম আর সাধারণের অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরলেও এখন পর্যন্ত ফলপ্রসূ কোন পদক্ষেপ সরকার নিতে পারেনি। যে কারণে দিন দিন ভূমি অফিসগুলো চরম দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অভিযুক্তদের মন্তব্য, সরকারি অফিসে কীভাবে বাইরের লোক কাজ করছে এবং নামজারিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন বেশি টাকা নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে টেকনাফ ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা যে টাকা এখান থেকে পাই সেটা শুধুই আমাদের পকেটে যায় না, আমাদের ওপর মহলের নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের অনেকে ভাগ পায়। তাছাড়া ভূমি অফিসের টাকা নেয়ার বিষয়টি এখন সবার সামনেই ঘটছে।

সুশীল সমাজের অভিযোগ ,
ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তার সাথে এ ধরনের ভূমি কর্মকর্তাদের দহরম মহরম সম্পর্কের কারণে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পার পেয়ে যান ।

সাধারণ জনগণের দাবি,
যদি সরকারের আইন মোতাবেক কাজ হতো এবং আইন অনুসারে দোষীরা শাস্তি পেত তাহলে তাদের এই দুর্ভোগের শিকার হতে হতো না।

টেকনাফ বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য