২৩শে মে, ২০১৯ ইং, ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ই রমযান, ১৪৪০ হিজরী

রাবেয়ার​ হাতে বলি হলেন মাহফুজ

বৃহস্পতিবার,০৮ জুন ২০১৭

ডেস্ক সংবাদ : অপহরণের পর মাহফুজ সরকার নামে এক কলেজছাত্রকে বীভৎসভাবে খুন করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। রাবেয়া ইসলাম রাবু নামে এক ঘাতক মহিলা ও তার আত্মীয়রা মাহফুজকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ৬/৭ টুকরা করে ট্রলিব্যাগে ভর্তি করে মেঘনার পানিতে ফেলে দিয়েছে। নিখোঁজের ৪ দিন পর মঙ্গলবার রাবেয়া আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে এই বীভৎস খুনের কথা স্বীকার করেছে। রাবেয়ার স্বীকারোক্তির পথ ধরে নরসিংদী থানা পুলিশ মাহফুজকে হত্যার কাজে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরি ও তার ব্যবহৃত কাপড় চোপড় উদ্ধার করেছে।

নিহত মাহফুজের বড় ভাই এড. মোস্তফা সরকার রাসেল জানিয়েছেন, নিহত মাহফুজ সরকার নরসিংদী সরকারি কলেজের বি.এ দ্বিতীয় বর্ষের নিয়মিত ছাত্র। গত ২৬শে মে শুক্রবার বিকালে মাহফুজ বাড়ি থেকে প্রতিদিনের মতো বেরিয়ে যায়। এরপর সেদিন রাতে আর বাড়ি ফিরেনি। তার পিতা আবদুল মান্নান সরকার ও বড় ভাই রাসেলসহ অন্য আত্মীয়রা তাকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ২৭শে মে নরসিংদী সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরদিন মাহফুজের মোবাইল থেকে একটি কল আসে তার বড় ভাই রাসেলের মোবাইল ফোনে। এই ফোন নাম্বার থেকে রাসেলকে জানানো হয় যে, মাহফুজ বর্তমানে তাদের হেফাজতে রয়েছে। এই নাম্বার থেকে এটাই তাদের শেষ কল। পরে অন্য নাম্বার থেকে কল দেয়া হবে। মাহফুজকে ফিরে পেতে হলে তাদেরকে ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। নতুবা তাকে হত্যা করা হবে। এ কথা বলে রাসেলকে ৪টি বিকাশ ও ৩টি রকেট নাম্বার দেয়। এরপর রাসেল ও তার পিতা আবদুল মান্নান সরকার অনন্যপায় হয়ে মাহফুজকে বাঁচানোর জন্য ৩টি রকেট নাম্বারে ১ লাখ টাকা পরিশোধ করে। এরপরও তারা মাহফুজকে ফেরত না পেয়ে নরসিংদী সদর থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন।

২৮শে মে নরসিংদী শহরের রাঙ্গামাটিয়া মহল্লার প্রবাসী আল-মামুুনের স্ত্রী ইনডেক্স প্লাজার এমডি গার্মেন্টস নামে একটি দোকানের মালিক রাবেয়া ইসলাম রাবু মাহফুজের বাড়িতে গিয়ে তার নিখোঁজের ব্যাপারে অযাচিত খোঁজখবর নেয়। মাহফুজের পিতা-মাতা ও ভাইবোনদের নিকট সহানুভূতি প্রকাশ করে রাবু জানায়, মাহফুজকে সে খুবই আদর-স্নেহ করতো। মাহফুজ তার নিকট থেকে টাকা ধার নিতো, আবার দিয়ে দিতো। তার সঙ্গে খুবই সু-সম্পর্ক ছিল। এসব কথা বলে রাবু, মাহফুজকে খোঁজাখুঁজি করার জন্য বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির নাম-ঠিকানা দেয়। সে বলে, এসব ব্যক্তিদের সঙ্গে মাহফুজের শত্রুতা ছিল। রাবু’র এধরনের কথাবার্তায় মাহফুজের পিতা-মাতা ও ভাইবোনদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হলে তারা ঘটনাটি অপহরণ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নরসিংদী থানার এসআই নুরে আলমকে জানায়। এসআই নুরে আলম ঘটনা বিস্তারিত জেনে মোবাইল ফোনে রাবুকে থানায় যেতে বলে। পুলিশের খবর পেয়ে রাবু অনেকটা বিচলিত হয়ে পড়লেও সে মাহফুজদের বাড়িতে গিয়ে জানায় যে, আমি আপনাদেরকে সহযোগিতা করলাম, আর আপনারা আমার কথা পুলিশকে বলে দিলেন বলে খেদোক্তি প্রকাশ করে। পরে আবার বলতে থাকে অসুবিধা নেই, মাহফুজ আমার ছোট ভাই, তার জন্য জীবন গেলেও আমার কোনো আপত্তি নেই। এই কথা বলে রাবু তার আরো দুই বোনকে নিয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় গিয়ে এসআই নুরে আলমের সঙ্গে দেখা করেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে এসআই নুরে আলম তাকে থানায় আটকে রেখে দুই বোনকে বিদায় করে দেয়। এরপর এসআই নুরে আলম তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু সে কোনো ক্লু দেয়নি। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শাহরিয়ার আলম ও ওসি গোলাম মোস্তফা যৌথভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এতেও সে পুলিশকে কোনো প্রকার ক্লু দেয়নি।

পরে সোমবার রাতে পুলিশ তাকে নরসিংদী পুলিশ অফিসে নিয়ে পুলিশ সুপার আমেনা বেগমের সামনে উপস্থাপন করে। পুলিশ সুপার আমেনা বেগম তার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা বলার পর তার মনে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। একপর্যায়ে তিনি তাকে গভীরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে মাহফুজকে খুনের কথা স্বীকার করে। পরে গত মঙ্গলবার পুলিশ তাকে নরসিংদীর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ফেরদৌস ওয়াহিদের নিকট ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। এতে সে স্বীকার করে যে, মাহফুজের সঙ্গে তার পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। এক পর্যায়ে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরে ক্ষিপ্ত হয়ে মাহফুজকে হত্যার পরিকল্পনা করে রাবেয়া।

সেই অনুযায়ী গত ২৬শে মে রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে মাহফুজকে ডেকে তার বাড়িতে নেয়। সেখানে ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব পরিকল্পিতভাবে রাবু তাকে জড়িয়ে ধরে। এসময় রাবুর ভাগিনা শাহাদাৎ হোসেন রাজু তাকে পেছন দিক থেকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর রাবু ও তার ভাগিনা শাহাদাৎ হোসেন রাজু মিলে তার মৃতদেহটি ৬/৭টি খণ্ডে খণ্ডিত করে ঘরে থাকা ডিপ ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখে। পরদিন শনিবার ফ্রিজ থেকে খণ্ডিত দেহটি একটি ট্রলিব্যাগে ঢুকিয়ে নৌকাঘাটে গিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে ট্রলিব্যাগে ভর্তি লাশটি পার্শ্ববর্তী বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মরিচাকান্দি এলাকায় মেঘনা নদীর গভীর পানিতে ফেলে দেয়। স্বীকারোক্তির পর পুলিশ মাহফুজকে হত্যার কাজে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরি ও মাহফুজের গায়ে থাকা কাপড় চোপড় উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পুলিশ এখনো লাশের তল্লাশি অভিযান শুরু করেনি।

এব্যাপারে নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি গোলাম মোস্তফা সাংবাদিকদেরকে জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল শনাক্ত করার পর ডুবুরি দল নিয়ে তল্লাশি চালানো হবে।

মানবজমিন

টেকনাফ বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য