২০শে জুন, ২০১৯ ইং, ৬ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ই শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বঙ্গবন্ধুর সেই প্রিয় আব্দুল জব্বার এখন মরে যাচ্ছেন জটিল অসুখে অর্থ কষ্টে!

মঙ্গলবার,১৫ আগস্ট ২০১৭

টেকনাফবার্তা২৪ডটকম

ফজলুল বারী : আপন সে জন
‘ওরে পাগলা, তুই গানই গা সারা জীবন’
‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই’, ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’, ‘মুজিব বাইয়া যাও রে, অকূল দরিয়ায়’, ‘সাত কোটি মানুষের একটাই নাম, মুজিবর’-বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এসব গানের শিল্পীর নাম অনেকেরই জানা। বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করেন বুকের ভেতর। তিনি শিল্পী আবদুল জব্বার। লিখেছেন মাসিদ রণ।
তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ডাকেন ‘বাবা’ আর বঙ্গবন্ধু তাঁকে ডাকতেন ‘পাগলা’। হ্যাঁ, পাগল তিনি সত্যিই হয়েছিলেন। গান আর বঙ্গবন্ধুতে পাগল। যখন কলেজে পড়েন, তখন থেকেই এই পাগলামির সূচনা। তাই মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনে গানকে করেছিলেন হাতিয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মীদের সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠতা। ছাত্রলীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে বেড়াতেন। তখন ছয় দফা দাবিতে উত্তাল সারা দেশ। আগরতলা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন সময় আবদুল জব্বার গেয়ে চলেছেন, ‘আমাদের দাবি যারা মানে না, পিটাও তাদের পিটাও’, ‘বন্দি করে যদি ওরা ভাবে খেলা করেছি শেষ, তা হবে মস্ত বড় ভুল।’ এসব গান মানুষকে অধিকার সচেতন করেছে, জুগিয়েছে প্রেরণা।
তাই তো আগরতলা মামলায় ছাড়া পেয়েই তিনি যে কজন মানুষের খোঁজ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন আবদুল জব্বার। ‘একদিন বেতারে গানের রেকর্ডিংয়ে গেছি। হঠাৎ দেখি বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামাল আমাকে পেছন থেকে ডাকছেন। কাছে যেতেই বললেন, বাবা তোমাকে ডেকেছেন। আমি বললাম, বাবা কিভাবে ডাকল? উনি তো জেলে। তখন শেখ কামাল হেসে বললেন, বাবা ছাড়া পেয়ে ফিরে এসেছেন। সে দিনই রেকর্ডিং ফেলে ছুটলাম ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে। গিয়ে দেখি বাড়ির সামনে অনেক ভিড়। সবাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। ভিড় ঠেলে শেখ কামালের পেছন পেছন দোতলায় উঠে গেলাম। দেখলাম দীর্ঘদেহি পরিপাটি সেই মানুষটাকে। কতক্ষণ যে তাকিয়ে ছিলাম মনে নেই! বঙ্গবন্ধু বললেন, কিরে বেটা, এমন সব গান গাচ্ছিস, তোকে তো জেলে পাঠিয়ে দেবে ওরা। আমি বললাম, জেলে ঢোকালে ঢোকাক, আমি আগে আপনাকে মনপ্রাণ ভরে দেখে নিই। উনি ঈষৎ হেসেছিলেন। তারপর আমাকে বুকে টেনে নিলেন। ওই মুহূর্ত আমি জীবনেও ভুলব না। এখনো ওই মুহূর্তটা মনে করে ভাবি উনি বেঁচে আছেন, ৩২ নম্বর বাড়িতে গেলেই হয়তো দেখা পাব।’

‘ওরে পাগলা, তুই গানই গা সারা জীবন’
এরপর তো চলে এলো মুক্তির সংগ্রাম। গান দিয়ে যুদ্ধ করতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে চলে গেলেন আবদুল জব্বার। সেখানে তিনি কালজয়ী সব গান গেয়ে মুক্তিসেনাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। শুধু মুক্তিযুদ্ধ বা দেশপ্রেম দিয়ে নয়, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তিনিই সবচেয়ে বেশি গান গেয়েছেন। ‘মুজিব বাইয়া যাও রে, অকূল দরিয়া’, ‘সাত কোটি মানুষের একটাই নাম, মুজিবর’-এসব গান তিনি নিজেই উদ্যোগী হয়ে তৈরি করিয়েছেন। এ ছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গাওয়া ভারতের প্রখ্যাত গীতিকার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ও অংশুমান রায়ের গাওয়া ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’ গানটি আবদুল জব্বারই বাংলাদেশের আপামর জনতার সামনে পরিচিতি দিয়েছেন। অনেকে মনেই করেন এটি তাঁর মৌলিক গান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর তিনি গেয়ে বেড়িয়েছেন মতিউর রহমানের লেখা ও মলয় কুমার গাঙ্গুলির গাওয়া ‘যদি রাত পোহালেই শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই।’ তবে একটি গান তিনি নিজে সুর করে গেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘ওরে পাগলা, একটা গান বানা তো’। যেমন ভাষা শহীদদের নিয়ে আছে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে গানটা বানা। আমি সেদিনই লেগে গেলাম। ছুটে গেলাম কবির কাছে।

ফজল-এ-খোদা গানটি লিখেছিলেন-সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে। আমি সুর করে বঙ্গবন্ধুকে শুনালাম। উনি গানটা শুনে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, ‘তুই কী চাস বল। মন্ত্রী হবি।’ আমি বললাম, না। উনি বললেন, ‘তবে বেতারের বড় একটা চেয়ার দিই।’ আমি তাতেও রাজি হইনি। তখন উনি বললেন, ‘তাইলে তুই কী চাস।’ আমি বললাম, আমার এখনো অনেক গান গাইতে বাকি। আমি সারা জীবন গানই গাইতে চাই। উনি আমাকে মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘ওরে পাগলা, তুই গানই গা সারা জীবন।’ পুরো ঘটনাটা বলতে বলতে আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেন আবদুল জব্বার।

আবদুল জব্বার কিছু না চাইলেও বঙ্গবন্ধু কিন্তু তাঁকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। আবদুল জব্বারই একমাত্র শিল্পী, যিনি ১৯৭৩ সালে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে ‘বিপ্লবী শিল্পী’ হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক লাভ করেন। এই প্রাপ্তিকে সংগীত জীবনের বড় অর্জন বলে মনে করেন আবদুল জব্বার।

হঠাৎই আবেগতাড়িত হলেন শিল্পী আবদুল জব্বার। তিনি বললেন, ‘আমি তো বঙ্গবন্ধুকে টেবিল বাজিয়ে গান শুনিয়েছি। তাঁর রাজনীতি সামনে থেকে দেখেছি। তিনি করতেন গরিবের জন্য রাজনীতি। প্রায়ই বলতেন, ধনীরা তো ভালো আছে কিন্তু আমার গরিবের কী হবে। এই নিয়েও আমাকে গান বাঁধতে বলেন। প্রায়ই বলতেন, যুদ্ধের পর আমার কাছে নেই কোনো টাকাকড়ি। ওই গরিবদের কিভাবে খাওয়াব, পরাব।

এখনকার রাজনীতি দেখে দুঃখ হয়। তাই এখনকার রাজনীতিবিদদের বলতে চাই, আপনারা গরিবদের ভালোবাসেন। তাদের জন্য রাজনীতি করেন, তাহলে দেশ আবারও শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে।’ বঙ্গবন্ধুর সেই প্রিয় আব্দুল জব্বার এখন মরে যাচ্ছেন জটিল অসুখে অর্থ কষ্টে!

টেকনাফ বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য