১৯শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল

Sunday,13 May 2018

teknafbarta24.com

আরাকানের পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত হানাফিয়া টঙ্কি ও কৈয়াপুরি মতান্তরে কায়রাপরি টঙ্কি দু’টিকে যদি ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে ধরে নেয়া যায়, তাহলে আরাকানে মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল সপ্তম শতাব্দীতে। আরব থেকে তখন মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়ার নেতৃত্বে যে দলটি আরাকানে এসেছিল, তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। রানী কায়রাপরির সাথে মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন বলে দু’জনের আবাসস্থলের নামও হয় হানাফিয়া ও কৈয়াপুরি টঙ্কি। সময়টা ছিল মধ্য আরাকানের ধান্যবতী নগরীতে চন্দ্রসূর্য বংশীয় রাজত্বকাল। রাজা সূর্যমণ্ডলের সময় (৩১৩-৩৭৫) বৈশালীতে চন্দ্ররাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হলে ১০১৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তাদের শাসনকাল স্থায়ী হয়। ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে মাহাতেইং চন্দ্র বৈশালীর সিংহাসনে আরোহণ করে ৮১০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্বকালে আরব মুসলমানদের বেশ কিছু জাহাজ বঙ্গোপসাগরের বর্মি সীমানায় রণবী বা রামব্রী দ্বীপের সাথে সংঘর্ষে ডুবে যায়। ডুবন্ত জাহাজের যাত্রীরা বহু কষ্টে তীরে উঠতে পেরে বলতে লাগলেন, আল্লাহর ‘রহম’ যে, আমরা বেঁচে গেছি। ‘রহম’ শব্দটি শুনে আশপাশের লোকজনের ধারণা হয়, এরা রহম জাতি। রহম থেকে রোঁয়াই, রোয়াইঙ্গ, রোহাঙ্গ বা রোহিঙ্গা। আরাকানকে তৎকালে মানুষ রোহাঙ্গ নামে চিনত। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগীয় কবিরা যেমন : দৌলত কাজী, আলাওল, মর্দন, নস্রুল্লাহ খান প্রমুখ এ রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ হিসেবে উল্লেøখ করেছেন। ব

মানে মিয়ানমারের অধীনস্থ রাখাইন বা আরাকান প্রদেশই সেই রোসাঙ্গ রাজ্য। এটি ছিল তৎকালে বাংলা সাহিত্য চর্চার প্রাণকেন্দ্র। এখানেই কেটেছে মহাকবি আলাওলের কর্মময় জীবন।
পবিত্র আরব দেশের সাথে অত্র অঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপিত হয় বণিক শ্রেণী ও সমুদ্র অভিযাত্রীদের মাধ্যমে। সে সময়ে আগত আরবদের অনেকে স্থানীয় জনগণের সাথে মিলেমিশে আরাকান তথা রোহাঙ্গ রাজ্যে বসবাস আরম্ভ করেন। তৎকালীন আরাকানরাজ আরবদের উন্নত আচরণ দেখে সন্তুষ্টচিত্তে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেন তাদের। ব্যবসাবাণিজ্য ও ধর্মপ্রচারে ভারতবর্ষ, মধ্য এশিয়া এবং পারস্য থেকেও বহু লোকের সমাগম ঘটেছিল আরাকান তথা বর্তমান রাখাইন রাজ্যে। যারা যেখান থেকেই আসুক, আরাকানে বসবাসকারীরা রোহিঙ্গা। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল নিয়ে রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। এটি মুসলমানদের দ্বারা দুই শতাব্দীরও বেশি সময় শাসিত হয়েছে। ১৬৩০ সালের পরে আরাকানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। একপর্যায়ে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা দীর্ঘ সময় চলার কারণে মুসলমান নেতৃত্ব শাসনক্ষমতা হারায় ১৬৩৫ সালে।

দিল্লিতে তুঘলক বংশের শাসনের দুরবস্থার সুযোগে ভারতবর্ষে চাঘতাই তুর্কদের নেতা তৈমুলংয়ের আক্রমণে এবং সৈয়দ বংশীয় সুলতানদের আমলে মুসলিম সাম্রাজ্যের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল দিল্লির সুলতানদের শাসনের বাইরে চলে যায়। এতে শিক্ষা-সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র দিল্লি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও আঞ্চলিক রাজ্যগুলোতে মুসলিম সভ্যতা প্রসারিত হয় এবং মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠে। সে সময়েই ১২০৪-০৫ খ্রিষ্টাব্দে মোহাম্মদ বখতিয়ার খল্জি বাংলায় প্রবেশ করে গৌড়ে রাজধানী স্থাপন করেন। পরে গৌড়কে লখনৌতি নামেও অভিহিত করা হয়। প্রকৃত অর্থে ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকেরা ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী ছিলেন কিংবা অনেকে ধার্মিকও ছিলেন। কিন্তু সুফি-সাধক, আলেম-ওলামা অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ না হলে ইসলামের প্রসার সম্ভব হতো না। সে সময়ের শাসকশ্রেণী রাজ্য বিস্তার ও নিজেদের বিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্যস্ত থাকাকালে হজরত শেখ মুঈন উদ্দীন চিশ্তি রহ:, শেখ ফরিদ গঞ্জ-ই-শকরগঞ্জ রহ:, শেখ কুতুব উদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহ:, শেখ বাহাউদ্দীন রহ:, শেখ নেজাম উদ্দীন আউলিয়া রহ:, শেখ শরফ উদ্দীন ইয়াইহয়া মানিরী রহ:, শেখ জালাল উদ্দীন তাবরেজী রহ: ও শেখ নূর কুতুবুল আলম রহ:-দের মতো মহান মনীষীরা সমগ্র ভারতবর্ষে ইসলামের সাম্য, সম্প্রীতি ও মৈত্রীর বাণী প্রচারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। তাদের উন্নত চরিত্র এবং গুণাবলির আকর্ষণে বহু অমুসলিম ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূল ছাড়িয়ে আরাকানেও যেসব অলি বুজুর্গদের দরগাহ পরিলক্ষিত হয় সবাই এ অঞ্চলে এসেছিলেন ইসলাম ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে মানুষকে আহ্বান জানাতে।

লেম্বো নদীর তীরবর্তী লংগিয়েত বা লংগ্রেতের ছেলে মিঙ সাও মুঙ, কারো মতে মিন স মোয়ান ওরফে নরমিখলা ১৪০৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানের রাজা হলেন। কিছু দিনের মধ্যে দেল্যা নামক এক সামন্ত রাজার বোনকে নরমিখলা কর্তৃক অপহরণের ফলে অন্য সামন্ত রাজা ঘা-থান-ডির নেতৃত্বে সব রাজা ঐক্যবদ্ধভাবে বর্মি রাজা ঘেঙ শো আইকে আরাকান দখলের আমন্ত্রণ জানান। তিনি ৩০ হাজার সৈন্যবাহিনী নিয়ে আরাকান আক্রমণ করেন ১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দে। নরমিখলা তখন রাজ্যচ্যুত হয়ে গৌড়ে বঙ্গদেশের স্বাধীন সুলতান গিয়াস উদ্দীন আযম শাহের দরবারে এসে আশ্রয় নেন। তিনি দীর্ঘ চব্বিশ বছর নির্বাসিত জীবন শেষে গৌড়ের তৎকালীন সুলতান জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ শাহের সহায়তায় আরাকানের সিংহাসনে পুনঃঅধিষ্ঠিত হন ১৪৩০ সালে। নরমিখলা বা মিন স মোয়ান তখন মেকে সুলতান কর্তৃক প্রেরিত মুসলিম সৈন্যদের স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করার সুযোগ দেন। ইতোমধ্যে নরমিখলা নিজের বৌদ্ধ নামের পরিবর্তন করে মুসলিম নাম ধারণ করেন ‘মোহাম্মদ সোলায়মান শাহ্।’ বার্মার ইতিহাসে তিনি ছাড়াও তৎপরবর্তী আরাকানের ১৮ জন রাজা নিজেদের বৌদ্ধ নামের সাথে একটি মুসলিম নামও গ্রহণ করেছিলেন। সে সময় ফারসি ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। মুদ্রাপ্রথা চালু করে মুদ্রার এক পৃষ্ঠায় কালিমা শরিফ এবং অপর পৃষ্ঠায় তাদের মুসলিম নাম ও অভিষেক কাল উৎকীর্ণ করা হয়। ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হওয়া এ প্রথা ১৫৪৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ১১৪ বছর চালুছিল। রাজকীয় সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্য থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিচারকার্য পরিচালনার কাজীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য সব পর্যায়ে মুসলমানদের মধ্যে থেকেই নিয়োগ দেয়া হতো। তন্মধ্যে চন্দ্র সুধর্মার পিতার রাজসভার প্রধানমন্ত্রী কোরেশী মাগন ঠাকুর, তৎপরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নবরাজ মজলিস, রাজা সুধর্মার ঈড়সসধহফবৎ রহ পযরবভ এবং রোসাঙ্গের বিচারপতি সৈয়দ মাসুম শাহের নাম উল্লেখযোগ্য। উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পদ-পদবিতে নিয়োগ পেয়ে আরাকান তথা বর্তমান রাখাইন রাজ্যের মুসলমানরা প্রশংসিত হয়েছিলেন।

১৭৮৪ সালে বর্মিরাজ বোধাপায়া যখন স্বাধীন আরাকানকে বার্মার একটি প্রদেশে রূপান্তর করেন, তখন তিনি নিজেও মুদ্রাপ্রথার সাথে পরিচিত ছিলেন না। বোধাপায়া আরাকানের অনুকরণে সমগ্র বার্মা বা মিয়ানমারে বিচার ও মুদ্রাব্যবস্থা চালু করেন। নতুন এ ব্যবস্থা যাতে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় সে জন্য বোধাপায়া ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুসলমানদের ৩৭০০ জনকে আরাকান থেকে বার্মায় নিয়ে যান।

দেখা যাচ্ছে- একদিন যাদেরকে জোরপূর্বক বার্মাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সরকার পরিচালনার জন্য, তারাই পরে হয়ে গেল কথিত বহিরাগত। তারও আগে নরমিখলা রাজ্য শাসনক্ষমতা ফিরে পেতে এবং আরাকানে সুভ্যতা সৃষ্টিতে মুসলমানেরা অবদান রেখেছিলেন। তবুও তাদের কোনো স্থান নেই সেখানে। উপরন্তু অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, রোহিঙ্গারা ‘ভিন্ন দেশী’। তবে রোসাঙ্গ সভ্যতার ধারকবাহক যারা তারা বার্মা বা মিয়ানমারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় পথ দেখিয়েছেন। বর্তমান বার্মায় যারা থুম টং খুইয়া নামে পরিচিত তারা আর কেউ নয়- ওই তিন হাজার ৭০০ জনের বংশধরেরাই।

নয়া দিগন্ত

টেকনাফ বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য