১৭ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ২রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

তালিকায় পুলিশ ও বিজিবির সদস্য এবং পৃষ্ঠপোষকের পাঁচজনেরই নাম নেই

Thursday,31 May 2018

teknafbarta24.com

  • মাদক ব্যবসার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক আলী মুনছুর
  • আলী মুনছুর সাংসদ আলী আজগরের ছোট ভাই
  • অভিযোগ অস্বীকার আলী মুনছুরের

রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ চুয়াডাঙ্গায় ১১৯ জন নারী-পুরুষ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এই অবৈধ ব্যবসার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক সাংসদ আলী আজগরের ছোট ভাই আলী মুনছুর। তিনি দর্শনা পৌর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদকও। দর্শনা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা জয়নাল আবেদীন ওরফে নফর তাঁর সহযোগী।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি প্রতিবেদনে এই জেলায় ১১১ জনকে মাদক পাচারকারী ও ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাতে পুলিশ ও বিজিবির ১৬ জনসহ সাতজন পৃষ্ঠপোষক এবং পাঁচ ভারতীয়ের নাম ছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো ১১১ জনের মধ্যে ২৬ জনেরই নাম নেই। কিন্তু নতুন করে ৩৪ জনের নাম সংযোজিত হয়েছে তালিকায়। এই তালিকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ প্রতিবেদনে থাকা পুলিশ ও বিজিবির সদস্য এবং সাত পৃষ্ঠপোষকের পাঁচজনেরই নাম নেই।

আবার জেলা পুলিশের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী আলমডাঙ্গা উপজেলায় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ২১। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় এদের মাত্র তিনজনের নাম আছে। আবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের প্রতিবেদনে ওই তিনজনের মধ্যে মিজানুর রহমান ও আনোয়ার হোসেনকে কৃষক বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত ৭ মে আলমডাঙ্গা থানা-পুলিশ মিজানুরকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনি এখন জেলা কারাগারে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নাম আসার বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন আলী মুনছুর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাই সাংসদ আলী আজগর তাঁর নির্বাচনী এলাকায় স্মরণকালে ব্যাপক উন্নয়ন করার কারণে জনপ্রিয়। তাঁকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ষড়যন্ত্র চলছে। যাঁরা তালিকা তৈরি করেছেন, তাঁরা প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাকে মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখিয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুয়াডাঙ্গায় পুলিশ ও বিজিবির কিছু অসৎ সদস্য ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির আত্মীয়স্বজন ভারতীয় মাদক ব্যবসায়ীদের সহায়তায় মাদকদ্রব্য এনে সারা দেশে সরবরাহ করে আসছেন। এতে চুরি-ডাকাতি, অপহরণ ও খুনের মতো ঘৃণ্য সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক ও ব্যক্তিনিরাপত্তা ক্রমশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

জেলা পুলিশের উদ্যোগে গত বছরের ৬ মার্চ চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ মাঠে করা মাদকবিরোধী সমাবেশে জেলার চার উপজেলার ৪৩০ জন মাদক ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করেন। তাঁরা ভবিষ্যতে আর মাদক ব্যবসা করবেন না বলে অঙ্গীকার করেন। কিন্তু কয়েক মাস পর তাঁদের অনেকে মাদকসহ গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের পরনে ছিল মাদকবিরোধী সমাবেশে পাওয়া পোশাক। পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমানও বিষয়টি স্বীকার করেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী সদর থানা এলাকায় ৪৪টি স্থানে মাদক বিক্রি হয়। জেলা থেকে প্রধানত সাতটি রুটে মাদক পাচার ও পরিবহন হয়ে থাকে। মাদকের সবচেয়ে বড় মোকাম সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের আকন্দবাড়িয়া গ্রাম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সদর উপজেলায় যে ২৩ জন মাদক পাচারকারী ও ব্যবসায়ী আছেন, তাঁদের সাতজনের বাড়ি এই আকন্দবাড়িয়ায়। তাঁরা হলেন রশিদা বেগম, রহিমা খাতুন, ওয়াসিম, সায়েরা বেগম ওরফে ছোটবুড়ি, ইমাম হোসেন, একরামুল হক ও মহিদুল।

আকন্দবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা দর্শনা সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) জামাল উদ্দিন বলেন, মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিরা একে আর দশটি পেশার মতোই স্বাভাবিক মনে করেন। অপরাধ মনে করেন না। তাই এটা নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সচেতনতা তৈরি করা দরকার। তিনি জানান, গ্রামটিতে গত চার বছরে মাদকের কারণে অন্তত তিনজন মারা গেছেন। অনেকেই অসুস্থ। সহজলভ্য হওয়ায় শিশুদেরও একটি অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর থানা ঘেঁষে মাথাভাঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত সুইপার কলোনি। মাদকের বেচাকেনার একটি বড় জায়গা এই কলোনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে চুয়াডাঙ্গায় ১৯ ও ২০ মে রাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ জোনাব আলী ও কামরুজ্জামান খান নামের দুজন নিহত হয়েছেন। দুজনই জেলা পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। জেলা পুলিশের তথ্যমতে, কামরুজ্জামান খানের বাড়িতেই ছিল মাদকের আখড়া। জোনাব আলী ছিলেন শীর্ষ মাদক পাচারকারী। তাঁরা নিহত হওয়ার পর বাকি মাদক ব্যবসায়ীরা গা-ঢাকা দিয়েছেন। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকায় এ দুজনের নাম নেই।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাকে অসম্পূর্ণ উল্লেখ করে পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান বলেন, ওই তালিকায় স্থানীয়ভাবে বড় অনেক মাদক পাচারকারীর নাম নেই। স্থানীয়ভাবে আরও ৯৬ জনকে চিহ্নিত করে ২১৫ জনের একটি সম্পূরক তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

পুলিশ সুপার বলেন, চলমান অভিযানের পর শীর্ষ ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। চুয়াডাঙ্গা পুলিশ বিভাগ শূন্য সহনশীলতা নীতিই অনুসরণ করছে। প্রমাণ পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

প্রথম আলো

টেকনাফ বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য