এই মাত্র:
Search

                                                                         ২২শে মার্চ, ২০১৯ ইং, ৮ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৫ই রজব, ১৪৪০ হিজরী

একই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই নেত্রীর উত্থান

Saturday, 08 September 2018

teknafbarta24.com

আমার সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা ঘটে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। একই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই নেত্রীর উত্থান। ১৯৮৯ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আমার পত্রিকা (সাপ্তাহিক বিচিত্রা) থেকে পরিকল্পনা করা হয় তাঁদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নিয়ে দুটো প্রচ্ছদ প্রতিবেদন রচনার।

আমি বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করলাম। কিন্তু বিপত্তি বাধে আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়। তাঁর বন্ধু বলে পরিচিত এক সাংবাদিক বিচিত্রায় এসে বললেন, শেখ হাসিনা বিচিত্রার দুজন সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দেবেন না। তাঁদের একজন আমি। তাঁর এই বক্তব্য তখনই যাচাই করার সুযোগ ছিল না। আমার করা প্রশ্নাবলিতে তিনি শেখ হাসিনার উত্তর নিয়ে আসেন, লেখার সূচনা আর শেষ অংশও লিখি আমি। ছাপা হয় তাঁর নামে।

এরপর বহুদিন আমি বিষয়টি মেনে নিতে পারিনি। শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আমার ভ্রাতৃপ্রতিম কয়েকজন সাংবাদিক তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে তাঁর আতিথেয়তারও বহু গল্প আমি শুনতাম। এমন একজন নেত্রী আমার মতো সদ্য সাংবাদিকতা শুরু করা একজনের প্রতি কারণ ছাড়া বিরূপ হবেন কেন?

এর কয়েক মাস পর একদিন ৩২ নম্বরে তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। শুনলাম ভোরবেলায় তাঁর বাসায় ফ্রিডম পার্টি বোমা হামলা করেছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে রিপোর্ট করার সিদ্ধান্ত নিই। নিচতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাগজের স্লিপে নিজের নাম-পরিচয় লিখে পাঠাই। একটু পর তিনি নিজে বের হয়ে এসে আমাকে ডেকে ভেতরে নিয়ে যান, হামলার বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানান। আমার অনেক প্রশ্ন করার অভ্যাস ছিল। তিনি এমন পরিস্থিতিতেও সহজ ও সাবলীলভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দেন।

সাংবাদিক হিসেবে বহু বছর আমি তাঁকে এমনি জানতাম। তিনি বাকপটু, সাহসী, কথার পিঠে কথা বলায়ও তাঁর কোনো জুড়ি নেই। গুটিয়ে যান না, উত্তর এড়িয়ে যান না, অল্প কথায় কাজ সারেন না। এমন একজন নেত্রী যেকোনো সাংবাদিকের জন্য হতে পারেন পরম আরাধ্য ব্যক্তি। এমন অনেক বিষয়ে তাঁর কাছে প্রশ্ন করা যায়, রুষ্ট হলেও যার উত্তর তিনি দেবেন।

তাঁর সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনগুলোর খবর পড়ে আমার মনে হয়েছে, আমাদের সাংবাদিকদের অনেকে এই সুযোগটা হেলায় হারাচ্ছেন। প্রশ্ন করার পরিবর্তে কেউ কেউ অযাচিতভাবেই তাঁর স্তুতিতে মেতে ওঠেন। কেউ কেউ জানান নালিশ, সেই নালিশও তাঁর সরকারের কারও ব্যর্থতার জন্য নয়, বিরোধী দলকে গালমন্দ করার জন্য।

সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে দেখি একজন তাঁর স্তুতি করছেন, অন্যরা হর্ষধ্বনি দিয়ে উঠেছেন। হঠাৎ শুনলে মনে হবে সংবাদ সম্মেলন না, আনন্দমেলা ধরনের কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে সেখানে।
অথচ তাঁর সংবাদ সম্মেলন হতে পারে আরও অনেক অর্থবহ এবং গুরুত্বপূর্ণ।

২.
আমি বিদেশে পড়াশোনাকালে নিয়মিত বিবিসি টেলিভিশন দেখতাম। এখনো দেখি। আমার জানামতে, সরকারপ্রধানেরা সাধারণত সংবাদ সম্মেলন এড়িয়ে চলতে চান। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন হয় খুব জরুরি কোনো বিষয় থাকলে, না হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের নিয়োগপ্রাপ্ত মুখপাত্ররাই সাংবাদিক সামলানোর চেষ্টা করেন।

তাই বলে সব সংবাদ সম্মেলন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যেমন, দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলন। এ ছাড়া বাকি সংবাদ সম্মেলনগুলো সাধারণত স্বেচ্ছাপ্রণোদিত; সরকারপ্রধানেরা বা অন্য কেউ নিজে থেকে ডাকেন। কখনো তা কোনো সংকট বা সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করার জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। কখনো তা তেমন জরুরি না হলেও ডাকা হয়।

আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বহু সংবাদ সম্মেলন ডাকেন স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে। এখন কী অবস্থা জানি না, তবে তিনি বিরোধী দলের নেত্রী থাকার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতেন। আমাকে তাঁর ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকেরা এ-ও বলে থাকেন যে, যেকোনো বিষয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন শোনার মানসিকতাও তাঁর ছিল।

এটি এখনো আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। তাই ভাবি, এমন একজন প্রধানমন্ত্রীকে সংবাদ সম্মেলনে কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই না প্রশ্ন করা যায়। তিনি বিমসটেক সম্মেলন থেকে ফিরে এসে সাংবাদিকদের ডেকেছিলেন। কিন্তু সেখানে কথাবার্তা হয়েছে অন্য বিষয় নিয়েই বেশি। বিমসটেক নিয়েই প্রশ্ন হলে আমি হয়তো তাঁর কাছে জানতে চাইতাম, বিমসটেক থেকে বাংলাদেশের আসল প্রাপ্তি কী হবে? এটি কি সার্ককে উপেক্ষা করা, নাকি এর পরিপূরক কিছু? কিংবা জিজ্ঞেস করতাম সেখানে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গটি উত্থিত হয়েছে কি না, না হলে তা কেন?

যেহেতু অন্য বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, সেখানে প্রশ্ন করা যেত: ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকী আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের গ্রেপ্তারের সমালোচনা করেছেন, আপনার প্রতিক্রিয়া কী? জানতে চাওয়া যেত: খালেদা জিয়ার বিচার নিয়ে এত তোড়জোড় চলছে, আর হত্যা মামলায় এরশাদের বিচার বা দুর্নীতি মামলায় আপনার দলের কারও কারও বিচার বহু বছর ধরে ঝুলে আছে-এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া যেত আরও বহু কিছু বিষয়। নির্বাচনে কারচুপি, গুমের বিচারহীনতা, ব্যাংক লুটসহ বিভিন্ন দুর্নীতির বিষয়ে তাঁকে কখনো সরাসরি প্রশ্ন করা হয় কি? সংবাদ সম্মেলনে যখন উন্মুক্ত বিষয়ে কথাবার্তা শুরু হয়, তখন কি এসব প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ থাকে না?

আমি বিবিসি এমনকি ভারতীয় এনডিটিভির সাংবাদিকতা দেখে সংবাদ সম্মেলন বলতে এমন ধারার প্রশ্ন করাই বুঝি। অবশ্যই সেখানে সৌজন্য দেখাতে হবে, অবশ্যই ভালো কাজের জন্য অভিনন্দন জানানো যেতে পারে। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের মুখ্য বিষয় হচ্ছে সরকারের আচরণ, ব্যর্থতা বা পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া, মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সম্মান করা। কিছুটা হলেও সরকারপ্রধানের জবাবদিহির চর্চা করা।

৩.
সরকারপ্রধানকে জবাবদিহির মুখে রাখা পরিশুদ্ধ গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রীকে বিরোধী দলের, এমনকি সরকারি দলের এমপিরা কঠিন, কঠোর, চাঁছাছোলা প্রশ্ন করেন অনেক সময়। আমেরিকার সিনেটে এবং বিভিন্ন সংসদীয় কমিটিতে প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করা হয় নির্দয়ভাবে। সেখানে এমনকি উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের সময় প্রকাশ্যে যেভাবে তাঁর সব জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হয়, সেটাই সুশাসন ও আইনের শাসনের জন্য সবচেয়ে মানানসই।

আমাদের দেশে কোনো সংসদ প্রধানমন্ত্রীকে সঠিকভাবে জবাবদিহি করাতে পারেনি। নব্বই-পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জবাবদিহির নামে মূলত দুই নেত্রীর সাংসদেরা একে অপরকে কটুবাক্যে ব্যস্ত থাকতেন। তবু তখন কিছুটা হলেও জবাবদিহি ছিল, এখন সংসদে সরকারের অংশীদার হয়ে যে অদ্ভুত বিরোধী দলটি আছে, তাতে সেটিও বিলুপ্ত হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন হতে পারে বিকল্প সংসদ ধরনের কিছু। সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, আচরণ ও পরিকল্পনা নিয়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে প্রশ্ন করার সুযোগটি সেখানে হাতছাড়া করার পেছনে কী সৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে?

তবে এ ক্ষেত্রে সরকারেরও কিছুটা দায়দায়িত্ব রয়েছে। এশিয়ান এজ নামের একটি পত্রিকায় পড়লাম, প্রধানমন্ত্রীর ওই সংবাদ সম্মেলনে দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক পত্রিকার সাংবাদিকদের ডাকা হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে সংবাদমাধ্যম জগতের বাইরের অনেক মানুষজনও আমন্ত্রিত ছিলেন বলা হয়েছে সেখানে। সেগুলো সত্যি হলে তা সংবাদ সম্মেলনের চরিত্রকে ব্যাহত করেছে, মানুষকে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে তা অপ্রীতিকর বার্তা দিতে পারে।
আরেকটা কথা, সংবাদ সম্মেলনে প্রায়ই দেখি সম্পাদকদের প্রাধান্য। আমার কাছে এটাও অদ্ভুত লাগে। আমার জানামতে, অন্যান্য দেশে এটা সাধারণত হয় না। আমাদের এখানে হয় কেন?

আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

টেকনাফ বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য