২১শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং, ৮ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ই শাবান, ১৪৪০ হিজরী

৩০ বছর পর ক্ষমতাচু্যত হলেন বশির

Friday,12 April 2019

teknafbarta24.com

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সুদানে যেভাবে ওমর আল-বশিরের শাসনামল শুরু হয়েছিল, সেভাবেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হলো।

টেলিভিশন ঘোষণায় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আওয়াদ ইবনে ওউফ নিশ্চিত করেছেন যে, আল-বশিরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক কাউন্সিল দুই বছরের জন্য দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। একটি নির্বাচন আয়োজন করা হবে তাদের দায়িত্ব।

তিনমাসের জন্য দেশটিতে জরুরি অবস্থা এবং একমাসের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে।

তিনি আরো জানিয়েছেন, ওমর আল-বশিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং একটি নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে।

কয়েক দশকের যুদ্ধ

আল-বশিরের রাজনৈতিক জীবনকে যুদ্ধ দিয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করা যায়।

১৯৮৯ সালে তিনি ক্ষমতায় আসেন এবং শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করেছেন। ২০১১ সালে বিভক্ত হয়ে দক্ষিণ সুদানের জন্ম না হওয়া পর্যন্ত এই দেশটি ছিল আফ্রিকার সবচেয়ে বড় দল।

যখন তিনি ক্ষমতা দখল করেন, সুদান তখন উত্তর আর দক্ষিণের মধ্যে ২১ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে।

মি. বশির শক্ত হাতে জবাব দিতে শুরু করেন। তার বিরুদ্ধে দমন পীড়ন এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।

তার বিরুদ্ধে ২০০৯ ও ২০১০ সালে দুইটি আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারের পরোয়ানা জারি করা হয়। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি ২০১০ ও ২০১৫ সালের দুইটি নির্বাচনে বিজয়ী হন। তার সর্বশেষ নির্বাচন বিরোধীরা বর্জন করে।

এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে তার ওপর আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়। তারপরেও মি. বশির মিশর, সৌদি আরব আর দক্ষিণ আফ্রিকায় ভ্রমণ করেন।

২০১৫ সালের জুনে তিনি অনেকটা বিব্রতকর ভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন, কারণ দেশটির একটি আদালত বিবেচনা করছিল যে, তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি কার্যকর করা হবে কিনা।

এই নারী কি সুদানের বিক্ষোভের প্রতীক?

একীভূত সুদান

ক্ষমতা গ্রহণের আগে সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন মি. বশির। তিনি বিদ্রোহী নেতা জন গ্যারাঙ্গের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ অভিযান পরিচালনা করেন।

যখন তিনি সুদানিজ পিপলস লিবারেশন মুভমেন্টের পক্ষে গ্যারাঙ্গের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন, তখন তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন যাতে চুক্তিটি পরাজয় বলে মনে না হয়।

তিনি বলেছিলেন,” আমরা অসহায় হয়ে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করিনি, বরং আমরা যখন বিজয়ের শীর্ষে ছিলাম, তখনি তাতে স্বাক্ষর করেছি।”

তার সবসময়েই লক্ষ্য ছিল একটি একীভূত সুদান রক্ষা করা, কিন্তু শান্তি চুক্তির অংশ হিসাবে দক্ষিণ সুদানের বিষয়ে একটি গণভোট আয়োজন করতে বাধ্য হন।

২০১১ সালের জানুয়ারির গণভোটে ৯৯ শতাংশ দক্ষিণ সুদানিজ ভোটার আলাদা হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। ছয় মাস পরে স্বাধীন দক্ষিণ সুদান ঘোষিত হয়।

যখন তিনি দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতার পক্ষে সম্মত হন, তখনো দারফুরের প্রতি তার মনোভাব ছিল আগ্রাসী।

উত্তর দারফুরে একটি অনুষ্ঠানে মি.বশির ২০০৯ সালে উত্তর দারফুরে একটি অনুষ্ঠানে বশির। 

কিন্তু কৃষ্ণাজ্ঞদের ওপর নির্যাতনের কারণে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত আরব জানহাওয়েড মিলিশিয়াদের তিনি সমর্থন করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেসব অভিযোগ করেছে, তা তিনি বরাবরই অস্বীকার করে গেছেন।

ওমর আল-বশিরের বিরুদ্ধে আইসিসির যেসব অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্যে আছে গণহত্যা, হত্যা, জোর করে বাস্তুচ্যুত করা, ধর্ষণ, নির্যাতন, দারফুরে বেসামরিক লোকজনের ওপর হামলা, গ্রাম ও শহরে লুটতরাজ করা।

সামরিক মনোভাব

মি. বশিরের জন্ম হয় ১৯৪৪ সালে উত্তর সুদানের একটি খামারি পরিবারে। সে সময় সেই এলাকাটি ছিল মিশরীয় রাজত্বের অংশ। তিনি একটি বেদুইন গোত্রের সদস্য ছিলেন।

তরুণ বয়সে তিনি মিশরীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলে বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর কর্মকর্তা পদে উন্নীত হন।

তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কমই জানা যায়। তার কোন সন্তান নেই এবং ৫০ বছর বয়সের দিকে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন।

তিনি সুদানের উত্তরের যুদ্ধ বীর হিসাবে পরিচিত ইব্রাহিম শামস আল-দ্বীনের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করেন।

সুদানের এই নেতার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সামান্যই জানা যায় সুদানের এই নেতার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সামান্যই জানা যায়।

সংকট ও বিক্ষোভ

সম্প্রতি দেশটিতে রাজনৈতিক বিক্ষোভ জোরালো হয়ে ওঠে।

সরকার তেল ও রুটির দাম বাড়ানোর পর তার ৩০ বছরব্যাপী শাসনামলের মধ্যে গত ডিসেম্বরে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ শুরু হয়।

গত কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিকভাবে সংকটে ভুগছে সুদান, বিশেষ করে দক্ষিণ সুদান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর। কারণ দেশের মোট উত্তোলিত তেলের চারভাগের তিনভাগই রয়েছে দক্ষিণ সুদানে।

মুদ্রামান করে যাওয়া ও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংকটে পড়েছে দেশের মানুষজন।

মি. বশিরের শাসনামলে দেশটি ২০১৮ সালের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির তালিকায় ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭২ নম্বরে রয়েছে।

এ বছরের জানুয়ারিতে খার্তুমে সরকার বিরোধী বিক্ষোভএ বছরের জানুয়ারিতে খার্তুমে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ

সর্বশেষ প্রতিরোধ

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি এক বছর মেয়াদি জরুরি অবস্থা জারি করেন মি. বশির। তার মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনেন এবং দেশের সব স্টেট সরকারের গভর্নরদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বসিয়ে দেন।

কোন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবিও নাকচ করে দেন। তার দাবি, বিক্ষোভকারীরা ২০২০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দিতে পারবে।

বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে সরকারের বিরুদ্ধে।

কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, গত ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ৩৮জন মানুষ নিহত হয়েছে, যদিও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি।

জাতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, তারা সকল রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে যাচ্ছে।

কিন্তু এটা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয় যে, সামরিক বাহিনী সুদানের স্থায়ীভাবে থেকে যেতে চাইবে কিনা।

বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তারা চান না, একজন কর্তৃত্ববাদী শাসকের বদলে আরেকজন সেইরকম শাসক ক্ষমতায় আসুক।

সুতরাং যখন মি. বশিরের পতনে আনন্দ করছে সুদানের লোকজন, তখন ভবিষ্যতে কোন শাসক আসছে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে।

টেকনাফ বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য